অধ্যায়-৩
দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা এবং দেওয়ানী
আদালত
দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা
দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ ধারায় বলা হয়েছে বিধিনিষেধ ছাড়া দেওয়ানী আদালত সকল প্রকার দেওয়ানী প্রকৃতির মামলার বিচার করবেন। যে সকল মোকদ্দমায়/মামলায় কোন স্বত্ব বা অধিকারের প্রশ্ন জড়িত থাকে সে সকল মামলাকে দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা বলা হয়। যদি কোন ব্যক্তি তার স্থাবর বা অস্থাবর যে কোন প্রকৃতির সম্পত্তির মালিকানা বা স্বত্বের প্রশ্নের সম্মুখীন হয় তাহলে উক্ত ব্যক্তি দেওয়ানী মামলা করতে পারেন। আবার, যে কোন ধরনের অধিকার, যেমনঃ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের অধিকার, চলাচলের অধিকার, পদের অধিকার হরন হলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে উক্ত অধিকার বহাল রাখার জন্য কিংবা ক্ষতিপূরনের জন্য দেওয়ানী মামলা করতে পারেন। এরূপ যে কোন ধরনের অধিকার বা স্বত্বের প্রশ্নে দায়েরকৃত মামলাকে দেওয়ানী মামলা বা দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা বলা হয়।
দেওয়ানী আদালত সমূহঃ
দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭ (Civil Courts Act, 1887) এর ৩ ধারা অনুযায়ী দেওয়ানী আদালত ৫ প্রকার। যথাঃ
১) জেলা জজ আদালত
২) অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত
৩) যুগ্ম-জেলা জজ আদালত
৪) সিনিয়র সহকারী জজ আদালত
৫) সহকারী জজ আদালত
উপরোক্ত আদালত সমূহ দেওয়ানী মামলা বিচারের ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক ও স্থানীয় অধিক্ষেত্রের এখতিয়ার সম্পন্ন মামলার বিচার করা ছাড়া ও অন্যান্য দেওয়ানী প্রকৃতির মামলার বিচার করে থাকেন। যেমনঃ- অর্থ ঋন আদালতের বিচার করেন যুগ্ম জেলা জজ আদালত, পারিবারিক আদালতের বিচার করেন সহকারি জজ আদালত।
দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ারঃ
দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮ এবং দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭ সালের আইন অনুযায়ী দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা বিচারের ক্ষেত্রে দেওয়ানী আদালতের বিভিন্ন ধরনের এখতিয়ার রয়েছে। এখতিয়ার গুলো নিম্নে আলোচনা করা হল
১) দেওয়ানী আদালতের আর্থিক
এখতিয়ারঃ
Civil Courts Act, 1887 এর ১৮, ১৯ এবং ২১ ধারায় আদালতের আর্থিক এখতিয়ার আলোচনা করা হয়েছে। দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮ এর ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক দেওয়ানী মোকদ্দমা বিচার করার যোগ্যতা সম্পন্ন সর্বনিম্ন আদালতে দায়ের করতে হবে। সর্বনিম্ন আদালত নির্ধারণ করা হবে আদালতের আর্থিক এখতিয়ারের মাধ্যমে। দেওয়ানী আদালতের আর্থিক এখতিয়ারের মধ্যে আদি এখতিয়ার এবং আপীল এখতিয়ার অন্তর্ভুক্ত।
আদি এখতিয়ারঃ
দেওয়ানী আদালত যে ক্ষমতা বলে প্রথমিক ভাবে কোন দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা আমলে নিতে পারে তাকে আদি এখতিয়ার বলে। সকল দেওয়ানী আদালতের আদি এখতিয়ার নেই। দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা গ্রহনের ক্ষেত্রে যুগ্ম জেলা জজ, সিনিয়র সহকারী জজ, সহকারী জজ আদালতের আদি এখতিয়ার আছে কিন্তু জেলা জজ আদালত এবং অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের আদি এখতিয়ার নেই তাই জেলা জজ এবং অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে প্রাথমিক ভাবে কোন দেওয়ানী প্রকৃতির মামলা দায়ের করা যায়না। মনে রাখতে হবে বিশেষ ক্ষেত্রে এবং আইনে উে থাকলে জেলা জজ আদি এখতিয়ার প্রয়ো করতে পারে কিন্তু অতিরিক্ত জেলা জজ করতে পারে কিন্তু অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের কোন আদি এখতিয়ার নেই।
Civil Courts Act, 1887 এর ১৮ ধারা অনুযায়ী
যুগ্ম-জেলা জজ আদালতের আর্থিক এখতিয়ার ৪,০০,০০১ টাকা থেকে সীমাহীন
Civil Courts Act, 1887 এর ১৯ ধারা অনুযায়ী
সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের আর্থিক এখতিয়ার ২,০০,০০১ টাকা থেকে ৪,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের মোকদ্দমা
সহকারী জজ আদালতের আর্থিক এখতিয়ার ২,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের মোকদ্দমা
আপীল এখতিয়ারঃ
সকল দেওয়ানী আদালতের আপীল এখতিয়ার নেই। যে সকল দেওয়ানী আদালতের আপীল এখতিয়ার আছে শুধু সে সকল আদালত আপীল নিষ্পত্তি করতে পারে। আদি এখতিয়ার সম্পন্ন আদালত (যুগ্ম জেলা জজ, সিনিয়র সহকারী জজ, সহকারী জজ আদালত) যখন রায় দেয়, সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপীল আদালতে আপীল দায়ের করতে হয়। হাইকোর্ট বিভাগ এবং জেলা জজ আদালত শুধু এই ২ ধরনের দেওয়ানী আদালতের আপীল এখতিয়ার আছে।
Civil Courts Act, 1887 এর ২১ ধারা
Civil Courts Act, 1887 এর ২১ ধারা
অনুযায়ী
হাইকোর্ট বিভাগের আপীল এখতিয়ার
৫,০০,০০০ টাকা থেকে সীমাহীন জেলা জজ আদালতের আপীল এখতিয়ার
৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত
Civil Courts Act, 1887 সর্বশেষ সংশোধন করা হয় ১২ মে ২০১৬সালে। সর্বশেষ সংশোধনের পর দেওয়ানী আদালত সমূহের বর্তমানে কার্যকর আর্থিক এখতিয়ার নিম্নরূপ
১৮ ধারা অনুযায়ী
যুগ্ম- জেলা জজ আর্থিক এখতিয়ার-সীমাহীন [যে কোন মূল্যমানের মোকদ্দমা]
১৯ ধারা অনুযায়ী
সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের আর্থিক এখতিয়ার ১৫,০০,০০১ টাকা থেকে ২৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের মোকদ্দমা
সহকারী জজ আদালতের আর্থিক এখতিয়ার ১৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের মোকদ্দমা
২১ ধারা অনুযায়ী
হাইকোর্ট বিভাগের আপীল এখতিয়ার ৫,০০,০০,০০১ (৫ কোটির অধিক) থেকে সীমাহীন
জেলা জজ আদালতের আপীল এখতিয়ার ৫,০০,০০,০০০ (৫ কোটি) টাকা পর্যন্ত
২) দেওয়ানী আদালতের বিষয়গত
এখতিয়ারঃ
দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ ধারায় বলা হয়েছে বিধিনিষেধ ছাড়া দেওয়ানী আদালত সকল প্রকার দেওয়ানী প্রকৃতির মামলার বিচার করবেন। দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ ধারা অনুযায়ী বারিত না হলে দেওয়ানী আদালত সব ধরনের দেওয়ানী মোকদ্দমার বিচার করবেন।
৩) আঞ্চলিক এখতিয়ারঃ
দেওয়ানী কার্যবিধির ১৬-২০ ধারায় দেওয়ানী আদালতের স্থানীয় আঞ্চলিক এখতিয়ার করা হয়েছে। আঞ্চলিক এখতিয়ার বলতে বুঝায় প্রত্যেকটি দেওয়ানী আদালতের নিজস্ব অধিক্ষেত্রের এখতিয়ার। প্রত্যেকটি দেওয়ানী আদালতের স্থানীয় অধিক্ষেত্রের এখতিয়ার আছে যার বাইরে মোকদ্দমার বিষয়বস্তু হলে আদালত মোকদ্দমা আমলে নিতে ও বিচার করতে পারেনা।
দেওয়ানী কার্যবিধির ১৬ ধারায় বলা হয়েছে মোকদ্দমা বিষয়বস্তু (বিরোধীয় স্থাবর সম্পত্তি) যে আদালতের আঞ্চলিক সীমানার মধ্যে অবস্থিত সেই আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে।
দেওয়ানী কার্যবিধির ১৭ ধারায় বলা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আদালতের এখতিয়ারে মোকদ্দমা
বিষয়বস্তু (বিরোধীয় স্থাবর সম্পত্তি) অবস্থিত হলে যে কোন একটি আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করা যাবে।
দেওয়ানী কার্যবিধির ১৮ ধারায় বলা হয়েছে যখন আদালতের আঞ্চলিক সীমানা অনিশ্চিত তখন যেকোন একটি আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করা যাবে।
দেওয়ানী কার্যবিধির ১৯ ধারায় বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি বা কোন অস্থাবর সম্পত্তি একটি আদালতের স্থানীয় সীমারেখার মধ্যে ক্ষতিসাধন করা হলে এবং বিবাদী অন্য আদালতের স্থানীয় সীমারেখার মধ্যে বসবাস করলে বা ব্যবসা করলে বাদী দুই আদালতের যেকোন একটি আদালতে ক্ষতিপূরনের মোকদ্দমা দায়ের করতে পারবে।
দেওয়ানী কার্যবিধির ২০ ধারায় বলা হয়েছে অন্যান্য মোকদ্দমার ক্ষেত্রে বিবাদী যেখানে বসবাস করে অথবা যেখানে মোকদ্দমার কারন উৎপত্তি হয়েছে সেখানে মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে।
No comments